Advertisement
advertisement
advertisement

থানচিতে লাগামহীন নৌ-সিন্ডিকেট, ধ্বংসের মুখে পর্যটন সম্ভাবনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

এপ্রিল ০১, ২০২৬, ০৭:০৮

থানচিতে লাগামহীন নৌ-সিন্ডিকেট, ধ্বংসের মুখে পর্যটন সম্ভাবনা

বান্দরবানের থানচি উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য আমিয়াখুম ও নাফাখুম জলপ্রপাত ভ্রমণে এবারের ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেছে নৌ-সিন্ডিকেট। লাগামহীন নৌ-সিন্ডিকেটের কারণে হুমকির মুখে পড়ছে সম্ভাবনাময় এই পর্যটন খাত।


এই অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে প্রশাসনের উদ্দেশে খোলা চিঠি লিখেছেন স্থানীয় পর্যটক গাইড ফ্রান্সিস ত্রিপুরা। খোলা চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন, থানচি ঘাট থেকে রেমাক্রি ও নাফাখুমে যাতায়াতের জন্য যেখানে নৌকার সাধারণ ভাড়া ৫ হাজার টাকা, সেখানে বর্তমানে মাঝিরা সিন্ডিকেট করে শুধু যাওয়ার জন্যই ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করছেন।


তার ভাষ্য, ‘জ্বালানি তেল সংকট’কে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে এই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। পর্যটকরা নিজেরা তেল কিনে দিলেও ভাড়া কমানো হচ্ছে না, বরং একই উচ্চ ভাড়া নেওয়া হচ্ছে—যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।


পর্যটক গাইড ফ্রান্সিস ত্রিপুরা মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) তার ফেসবুকে এই খোলা চিঠি প্রকাশ করেন। পরে তার পোস্ট বিভিন্ন ট্রাভেল গ্রুপে ছড়িয়ে পড়ে। ফ্রান্সিস ত্রিপুরার চিঠিটি নিচে দেওয়া হলো:


বান্দরবানের থানচি উপজেলা মানেই রোমাঞ্চ আর সৌন্দর্যের মিলনস্থল। এখানেই অবস্থিত বাংলার নায়াগ্রাখ্যাত নাফাখুম জলপ্রপাত এবং পাথুরে পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া অপূর্ব আমিয়াখুম জলপ্রপাত। রেমাক্রি খালের পাথুরে পথে ট্র্যাকিং করে এই স্বর্গীয় সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক ভিড় করেন। এই দুর্গম পথে যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম হলো থানচি ঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা। কিন্তু বর্তমানের লাগামহীন নৌ-সিন্ডিকেট এই পর্যটন সম্ভাবনাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।


আমি ফ্রান্সিস ত্রিপুরা দীর্ঘ দিন ধরে থানচির পাহাড় ও ঝরনার পথে পর্যটকদের গাইড হিসেবে সেবা দিয়ে আসছি। পাহাড়কে ভালোবাসি বলেই এই পেশায় আসা। কিন্তু গত ২৬ মার্চ আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা আমার পেশাদার জীবনের সবচেয়ে বড় গ্লানির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাঁদপুর থেকে আসা ১৫ জনের একটি বড় টিমকে গাইড করার জন্য আমি ব্যক্তিগত কাজ ফেলে ঢাকা থেকে সারারাত জার্নি করে ২৫ তারিখ রাতে বান্দরবান পৌঁছাই। কিন্তু থানচি ঘাটে গিয়ে যা দেখলাম, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।


​সিন্ডিকেটের স্বরূপ ও কৃত্রিম ‘তেল সংকট’

​থানচি থেকে রেমাক্রি বা নাফাখুম যাতায়াতের জন্য নৌকার নির্ধারিত ভাড়া আসা-যাওয়া যেখানে সাধারণত ৫,০০০ টাকা, সেখানে এই মৌসুমে মাঝিরা সিন্ডিকেট করে শুধুমাত্র যাওয়ার জন্যই ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত দাবি করছে! তারা ‘তেল সংকট’-এর এক হাস্যকর অজুহাত দাঁড় করিয়েছে।


​অমানবিক কিছু বাস্তব চিত্র

​তেল দিলেও ভাড়া কমে না: অনেক পর্যটক বাইরে থেকে নিজেদের তেল কিনে নৌকায় ওঠার পরও তাদের কাছ থেকে ৯,০০০ টাকা ভাড়া দাবি করা হয়েছে। পর্যটকের তেলে নৌকা চললে ভাড়া কেন দ্বিগুণ হবে? এর কোনো যৌক্তিক উত্তর মাঝিদের কাছে নেই।

টাকার বিনিময়ে তেল প্রাপ্তি: মাঝিরা সাধারণ ভাড়ায় বলছে তেল নেই, কিন্তু ভাড়ার টাকা বাড়িয়ে দিলেই অলৌকিকভাবে তেল পাওয়া যাচ্ছে এবং নৌকা চলছে। এটি স্পষ্টতই একটি সাজানো ‘তেল সংকট’ এবং পর্যটকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার নগ্ন উৎসব।


থানচিতে লাগামহীন নৌ-সিন্ডিকেট, ধ্বংসের মুখে পর্যটন সম্ভাবনা


​পর্যটন খাতে এর ভয়াবহ প্রভাব

এই সিন্ডিকেটের কারণে আমাদের প্রিয় বান্দরবানের পর্যটন খাত বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে:


১. পর্যটক বিমুখতা: একবার যারা এভাবে প্রতারিত হচ্ছেন, তারা আর কখনো থানচি আসার সাহস করবেন না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই নেতিবাচক অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়লে পর্যটকরা বিকল্প গন্তব্য খুঁজবেন।


২. গাইডদের সম্মানহানি: আমরা গাইডরা আগে থেকে কথা দিয়েও মাঝিদের এই দুর্নীতির কারণে পর্যটকদের কাছে ‘মিথ্যাবাদী’ বা ‘অপেশাদার’ হিসেবে লজ্জিত হচ্ছি।


৩. অর্থনৈতিক ধস: পর্যটক আসা বন্ধ হলে থানচির হোটেল, রেস্টুরেন্ট এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চরম সংকটে পড়বেন। কয়েকশ পরিবার যারা এই খাতের ওপর নির্ভরশীল, তারা উপোস থাকবে।


​প্রশাসনের কাছে আমার আকুল আবেদন

​একজন গর্বিত গাইড হিসেবে আমি আজ পর্যটকদের সামনে দাঁড়াতে লজ্জিত। মাঝিদের এই স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ না হলে থানচির সুনাম পুনরুদ্ধার করা অসম্ভব। আমি থানচি উপজেলা প্রশাসন, বিজিবি এবং ট্যুরিস্ট পুলিশ বাংলাদেশ-এর কাছে বিনীতভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি:


​ভাড়া মনিটরিং: নৌকার ভাড়া পুনরায় যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করে ঘাটে ভাড়ার চার্ট ঝুলিয়ে দিন এবং কঠোরভাবে মনিটর করুন।


​লাইসেন্স বাতিল: ‘তেল সংকট’-এর নামে যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পর্যটকদের জিম্মি করছে, তাদের নৌকার লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করুন।


​অভিযোগ কেন্দ্র: পর্যটকদের দ্রুত অভিযোগ জানানোর জন্য ঘাটে একটি কার্যকর হেল্পডেস্ক বা অভিযোগ কেন্দ্র স্থাপন করুন।


​ভ্রমণ হোক আনন্দের, শোষণের নয়। আমরা চাই না আমাদের প্রিয় পাহাড়ের বদনাম হোক। আসুন, সিন্ডিকেট রুখে দিয়ে পাহাড়ের পর্যটনকে বাঁচাই।

google-news-feed
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

সম্পর্কিত খবর

সহজ ভাষায় মহানবী (সা.)–এর জীবনী লিখতে চান আসিফ নজরুল

সহজ ভাষায় মহানবী (সা.)–এর জীবনী লিখতে চান আসিফ নজরুল

বাংলাদেশে বিয়ে করেছেন সেই মনিকা

বাংলাদেশে বিয়ে করেছেন সেই মনিকা

প্রধানমন্ত্রীর কাছে এভারেস্টজয়ী শাকিলের খোলা চিঠি

প্রধানমন্ত্রীর কাছে এভারেস্টজয়ী শাকিলের খোলা চিঠি

ভুয়া অর্ডার দিয়ে হয়রানি করেছে জামায়াতের ভাইয়েরা: তারেক

ভুয়া অর্ডার দিয়ে হয়রানি করেছে জামায়াতের ভাইয়েরা: তারেক

প্রয়োজনে আবারও হাসনাতের পাশে দাঁড়াবেন মনির মেম্বার

প্রয়োজনে আবারও হাসনাতের পাশে দাঁড়াবেন মনির মেম্বার

‘একাত্তরকে অপমান করলে চব্বিশের অর্জন বিলীন হয়ে যাবে’

‘একাত্তরকে অপমান করলে চব্বিশের অর্জন বিলীন হয়ে যাবে’

Advertisement
advertisement
সর্বশেষ সংবাদ